আপনি এই ওয়েবসাইটের একটি টেক্সট(লিখিত) সংস্করণ দেখছেন, যা কম ডেটা ব্যবহার করছে। ছবি ও ভিডিওসহ মূল সংস্করণ দেখতে এখানে ক্লিক করুন
কলকাতার অলিপাবে মাটনের বদলে বিফ স্টেক দেওয়ার অভিযোগ নিয়ে সরগরম সামাজিক মাধ্যম
কলকাতার একটি অতি পরিচিত রেস্তোরাঁয় মাটনের বদলে গোমাংস খাওয়ানো হয়েছে বলে সামাজিক মাধ্যমে ঝড় তুলে দিয়েছেন এক ইনফ্লুয়েন্সার।
তারা 'মাটন স্টেক' অর্ডার করেছিলেন, কিন্তু তাদের না জানিয়েই 'বিফ স্টেক' খাওয়ানো হয়েছে বলে সামাজিক মাধ্যমে একটি ভিডিওতে জানিয়েছিলেন সায়ক চক্রবর্তী নামে ওই ইনফ্লুয়েন্সার।
তার অভিযোগের ভিত্তিতেই পুলিশ শেখ নাসিরুদ্দিনকে গ্রেফতার করে জেল হেফাজতে পাঠিয়েছিল। চারদিন হেফাজতে রাখার পরে মঙ্গলবার তার জামিন হয়েছে।
ভাইরাল সেই ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে যে খাবার পরিবেশনকারীর ধর্ম জানতে চাওয়া হচ্ছে এবং তিনি মুসলমান, এটা শোনার পরে বলা হচ্ছে যে তাকে যদি কেউ শূকরের মাংস খাইয়ে দেয় – তখন কী হবে।
ঘটনাচক্রে, প্রায় ৮০ বছরের পুরোনো অলিপাব নামের ওই রেস্তোরাঁয় চিকেন, মাটন, বিফ ও পর্ক – সবই পাওয়া যায় এবং মদ্যপান করার সঙ্গে সঙ্গে বহু মানুষ এগুলি খেয়ে থাকেন।
অলিপাব কর্তৃপক্ষ এখন গোটা ঘটনার জন্য ক্ষমা চেয়েছেন। কিন্তু সামাজিক মাধ্যম এখনো সরগরম হয়ে আছে এই অভিযোগে, যে ওই ইনফ্লুয়েন্সার ইচ্ছা করেই বিতর্ক বাঁধিয়ে ভিডিও করেছেন এবং সেটা সাম্প্রদায়িক উসকানি।
কেউ আবার ওই ইনফ্লুয়েন্সারের পুরোনো ভিডিও খুঁজে বের করে দাবি করছেন যে তিনি আগে একজন মুসলমান বন্ধুর বাড়িতে 'বিফ হালিম' খেয়েছিলেন।
ওই ইনফ্লুয়েন্সারের সমর্থনেও অনেককে দেখা যাচ্ছে সামাজিক মাধ্যমে লিখতে।
কী ঘটেছিল অলিপাবে?
ইনফ্লুয়েন্সার সায়ক চক্রবর্তী একটি ভিডিওতে দাবি করেন যে গত ৩০শে জানুয়ারি তারা মধ্য কলকাতার পার্ক স্ট্রিটের অলিপাবে খেতে গিয়েছিলেন।
ওই ভিডিওতে তার দাবি, "আমরা অর্ডার করেছিলাম মাটন স্টেক। আমাদের দিয়ে যাওয়া হলো বিফ স্টেক। স্বাভাবিকভাবে বলা হয়নি এটা কী। অর্ডার প্লেটে রেখে চলে গেছে। আমরা ভাবছি এটা মাটন স্টেক। আমরা খেয়ে নিলাম, দেন আরও একটা এসে দিয়ে গেল, বলছে এটা মাটন স্টেক – আপনারা দুটো দিয়েছেন – বিফ অ্যান্ড মাটন।"
এরপরে তিনি খাবার পরিবেশনকারীর ভিডিও করতে থাকেন এবং একনাগাড়ে বলে যেতে থাকেন যে কেন তাদের গোমাংস খাওয়ানো হয়েছে, তিনি যে ব্রাহ্মণ সেটাও উল্লেখ করেন।
এক পর্যায়ে ওই খাবার পরিবেশনকারীর ধর্ম জানতে চান মি. চক্রবর্তী।
তিনি বলেন, "হিন্দু না মুসলিম আপনি? মুসলিম। আপনাকে যদি শূকর খাওয়াই জোর করে, খেয়ে নেবেন আপনি?"
তার পরে মি. চক্রবর্তীর কথা, "আপনি আমাকে গোমাতাকে খাওয়ালেন আমাদেরকে।"
এরপরে রেস্তোরাঁর ম্যানেজারকে ডেকে আনা হয়।
সেই রাতেই পার্ক স্ট্রিট থানায় গিয়ে ওই খাবার পরিবেশনকারী, শেখ নাসিরুদ্দিনের বিরুদ্ধে অভিযোগ জমা দেন মি. চক্রবর্তী।
পুলিশ তাকে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেওয়ার অভিযোগে গ্রেফতার করে এবং আদালত চারদিনের জেল হেফাজতে পাঠায়।
অন্যদিকে সায়ক চক্রবর্তী গোটা ঘটনার ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে পোস্ট করে দেন।
তারপরেই সেই ভিডিও হিন্দুত্ববাদী নেতা কর্মীরা শেয়ার করা শুরু করেন – খুব দ্রুত ভাইরাল হয়ে যায় সেটি।
অন্যদিকে সামাজিক মাধ্যমেই ব্যাপক বিতর্ক শুরু হয়।
End of বিবিসি বাংলায় আরও পড়তে পারেন
সামাজিক মাধ্যমে যা লেখা হচ্ছে
সায়ক চক্রবর্তীর রেকর্ড করা ওই ভিডিও সামনে আসতেই বহু মানুষ এ নিয়ে তর্ক জুড়ে দেন।
বলা হতে থাকে, যে রেস্তোরাঁয় গরুর মাংস পাওয়া যায়, সেখানে তিনি কেন খেতে গিয়েছিলেন, কেউ আবার বলেন ব্রাহ্মণ হয়ে তিনি কেন 'পাব'-এ গিয়েছিলেন।
কেউ আবার তারই টাইমলাইনে থাকা পুরোনো ভিডিও খুঁজে এনে লেখেন যে এক মুসলমান বন্ধুর বাড়িতে গিয়ে সায়ক চক্রবর্তীর 'বিফ হালিম' খাওয়ার ছবি।
আবার একথাও বলা হচ্ছে, তিনি 'বিফ স্টেক' খেয়েও বুঝতে পারলেন না যে সেটা মাটন নয়?
অনেকে এটাও লিখেছেন যে ওই রেস্তোরাঁয় 'বিফ স্টেক' অর্ডার করলে দুবার করে জেনে নেওয়া হয় নিশ্চিত হওয়ার জন্য – তাই রেস্তোরাঁর পক্ষে এরকম ভুল করা অসম্ভব।
এটাও অনেকে মনে করিয়ে দিয়েছেন যে অলিপাবে পর্ক, অর্থাৎ শূকরের মাংসের নানা পদও পাওয়া যায় এবং সেসব রান্না ও পরিবেশন করে থাকেন যারা, তারা প্রায় সকলেই মুসলমান।
আবার হিন্দুত্ববাদীদের কাছেও তাকে কথা শুনতে হয়েছে যে যেখানে গরুর মাংসের ডিশ বিক্রি হয়, সেখানে তিনি জেনে শুনেই কেন গিয়েছিলেন? কেউ আরও তীক্ষ্ণ স্বরে বলেছেন যে এখন গোমাংস খাইয়েছে এরপরে ধর্মান্তরিত করবে।
অলিপাবে যারা নিয়মিত যান অথবা একসময়ে যেতেন, তাদের কেউ কেউ লিখছেন যে হয়ত ভুল করেই বিফ দেওয়া হয়েছিল সায়ক চক্রবর্তীদের টেবিলে।
তবে একসময়ে অলিপাবের নিয়মিত ক্রেতা, সামাজিক মাধ্যমে যিনি খুবই সক্রিয় থাকেন, সেই সাংবাদিক অদিতি রায় বলছিলেন এটা অসম্ভব, ভুল হতে পারে না ওই রেস্তোরাঁর।
তার কথায়, "এই তথাকথিত ইনফ্লুয়েন্সার যা করেছে, সেটা খুব বিপজ্জনক ট্রেন্ড, খুবই উদ্বেগজনক। আমি সূত্র মারফত জেনেছি যে তারা মাটন আর বিফ দুটো স্টেকই অর্ডার করেছিল। তারপরে ভাইরাল হওয়ার জন্য ওই ভিডিওটা বানিয়েছে – পুরোটা সাজানো নাটক"।
"তবে কলকাতার মানুষও মোক্ষম জবাব দিয়েছে। যেভাবে সামাজিক মাধ্যমে তার এই নাটকের বিরুদ্ধে মুখ খুলেছে সবাই, আশা করি শিক্ষাটা তিনি পেয়ে গেছেন। এখন সামাজিক মাধ্যমে তো তার শিক্ষা হলো – আইনের শিক্ষাটাও পাওয়া দরকার। পুলিশের উচিত তাকে ডেকে জিজ্ঞাসাবাদ করা যে কেন সে একজন ওয়েটারকে হ্যারাস করল, তাকে গ্রেফতার করালো," বলছিলেন অদিতি রায়।
থানায় পাল্টা-পাল্টি অভিযোগ
বিতর্কটা শুধু সামাজিক মাধ্যমের মধ্যে আর সীমাবদ্ধ নেই। রোববার পার্ক স্ট্রিট থানার সামনে মানবাধিকারকর্মীরা বিক্ষোভ মিছিল করেন।
অন্যদিকে সায়ক চক্রবর্তীর বিরুদ্ধে দুটি অভিযোগ জমা পড়েছে পার্ক স্ট্রিট থানায়, আর একটি অভিযোগ স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে দায়ের করেছে পুলিশ।
যে দুটি অভিযোগ দায়ের হয়েছে, তার মধ্যে একটি জমা দিয়েছেন ফরিদুল ইসলাম।
মি. ইসলাম বলছিলেন, "সাম্প্রদায়িক অশান্তি ছড়ানোর উদ্দেশ্য নিয়ে ওই রিল বানানো হয়েছে এবং 'সাজানো' অভিযোগ করে উত্তেজনা সৃষ্টির চেষ্টা করেছেন সায়ক চক্রবর্তী।"
ওই ঘটনার পর অলিপাব বন্ধ রাখা হয়েছিল। তবে রোববার কর্তৃপক্ষ একটি বিবৃতি দিয়ে পুরো ঘটনার জন্য ক্ষমা চেয়ে নিয়েছেন। রেস্তোরাঁটি আবারও চালু হয়েছে।
কর্তৃপক্ষের ওই বিবৃতির পরেও অনেকে মন্তব্য করছেন যে রেস্তোরাঁর মালিক আর বিতর্ক বাড়িয়ে ব্যবসার ক্ষতি করতে চাননি, সেজন্যই তারা ক্ষমা চেয়েছেন।
এরপরে সায়ক চক্রবর্তী লিখেছেন, "অলিপাব শেষমেষ ক্ষমা চেয়েছে … আমাকে মানুষের ভরসায় চলতে হয়, তাই মানুষ যেটা বলছেন, হয়তো সেটাই ঠিক। আমি ওই ভদ্রলোক আর অলিপাবের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলে নিচ্ছি।"