মুসলমান ব্যবসায়ীর সমর্থনে এগিয়ে আসা হিন্দু যুবক 'মুহাম্মদ দীপক'-এর নামেই এবার মামলা পুলিশের

পড়ার সময়: ৪ মিনিট

'মুহাম্মদ' ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের নামের আগে থাকে আর দীপক নামটি সাধারণত হিন্দুদের হয়। তাই মুহাম্মদ দীপক নামটা শুনে অনেকেই অবাক হচ্ছেন ভারতের সামাজিক মাধ্যমে।

এরকম নাম শুনে অবাক হয়েছিলেন উগ্র হিন্দুত্ববাদী সংগঠন বজরং দলের সদস্যরাও। কিন্তু নিজের ওই নামই বলছিলেন উত্তরাখন্ডের কোটদোয়ার নামে ছোট্ট এক শহরের ওই বাসিন্দা।

তিনি যেভাবে একজন মুসলমান কাপড় ব্যবসায়ীয়ের সমর্থনে এগিয়ে এসে বজরং দলের কর্মীদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিলেন, সেই ঘটনার প্রশংসাও ছড়িয়ে পড়েছে সামাজিক মাধ্যমে। অনেকে আবার সামাজিক মাধ্যমে স্ট্যাটাস দিচ্ছেন, "আমার নামও মুহাম্মদ দীপক"।

কোটদোয়ারের ওই মুসলমান কাপড় ব্যবসায়ী কেন তার দোকানের নাম 'বাবা স্কুল ড্রেস অ্যান্ড ম্যাচিং সেন্টার' রেখেছেন, সেই প্রশ্ন তুলছিলেন বজরং দল কর্মীরা।

'বাবা' শব্দটি হিন্দুদের আরাধ্য দেবতা শিবকে বোঝাতে ব্যবহার করা হয়। সেই নাম কেন একজন মুসলমান ব্যবসায়ী তার দোকানে রাখবেন, সেটাই ছিল ওই হিন্দুত্ববাদীদের ক্ষোভের কারণ।

মি. দীপক বিবিসিকে বলেছেন যে, বজরং দল কর্মীদের বাধা দেওয়ার পর থেকেই তার ওপরে হামলা করতে রাজধানী দেরাদুন থেকে বজরং দলের অনেক কর্মীদের নিয়ে আসা হচ্ছে।

মুহাম্মদ দীপক আসলে কে?

সামাজিক মাধ্যমে 'মুহাম্মদ দীপক' নামে পরিচিত হয়ে ওঠা ওই যুবকের আসল নাম দীপক কুমার কাশ্যপ। তিনি উত্তরাখণ্ডের কোটদোয়ারে থাকেন এবং পেশায় একজন জিম প্রশিক্ষক।

ভাইরাল হওয়া একটি ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে, এক প্রবীণ মুসলমান দোকানদারের সমর্থনে বজরং দলের কর্মীদের মোকাবিলা করছেন তিনি।

গত ২৬শে জানুয়ারি ভারতের প্রজাতন্ত্র দিবসে বজরং দলের কয়েকজন কর্মী কোটদোয়ারের 'বাবা স্কুল ড্রেস অ্যান্ড ম্যাচিং সেন্টার' নামের দোকানে যান।

সেদিনের ঘটনা সম্পর্কে দীপক কাশ্যপ বিবিসির সহযোগী সাংবাদিক আসিফ আলিকে বলছিলেন যে বজরং দলের সাত - আট জন সদস্য প্রায় ৭৫ বছর বয়সী এক মুসলমান ব্যবসায়ীর ওই দোকানে যান। দোকানের নাম থেকে 'বাবা' শব্দটি সরিয়ে ফেলার জন্য চাপ দেওয়া হচ্ছিল।

ভিডিওটিতে দেখা গেছে বজরং দলের ওই কর্মীদের কথা বলার ধরন যথেষ্ট আক্রমণাত্মক ছিল।

এই সময়েই এক যুবক এগিয়ে এসে বজরং দল কর্মীদের বাধা দেন। মুসলমান ব্যবসায়ীর পক্ষ নিয়ে তর্ক করতে থাকেন।

বজরং দল কর্মীরা যখন ওই যুবকের নাম জানতে চান, তখন তিনি বলেন যে তার নাম মুহাম্মদ দীপক।

বিবিসিকে তিনি বলেছেন, "আমি কোনো রাজনৈতিক দলের কর্মী নই, আমি একটা বিচারধারার সমর্থক।

বাধা পেয়ে তখনকার মতো চলে যায় বজরং দল কর্মীরা।

দীপকের ওপরে হামলার চেষ্টা

দীপক কাশ্যপ বলছেন যে ২৬শে জানুয়ারির পর থেকে তাকে বার বার আক্রমণ করার চেষ্টা হচ্ছে।

তার কথায়, "৩১শে জানুয়ারি পরিস্থিতি হঠাৎই খারাপ হয়ে যায়। সেদিন দেরাদুন থেকে বজরং দলের প্রায় দেড়শো কর্মী কোটদোয়ারে আসে আর তার জিমে গিয়ে স্লোগান দিতে থাকে, হাঙ্গামা চালায়। সঙ্গে চলতে থাকে তাকে এবং তার পরিবারকে উদ্দেশ্য করে অশ্রাব্য গালিগালাজ। আমাকে তো সেখান থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু ওরা প্রায় চার-পাঁচ ঘণ্টা হাঙ্গামা করে।"

বিক্ষোভকারীদের সংখ্যা এতটাই বেশি ছিল যে স্থানীয় মানুষও তার সমর্থনে সামনে আসতে ভয় পাচ্ছিলেন। তার অভিযোগ, "বজরং দলের লোকেরা মারামারি করতেই এসেছিল। ওদের গাড়িতে অস্ত্র শস্ত্র ছিল।"

তার ওপরে যে হামলা হতে পারে, সেই আশঙ্কার কথা তিনি পুলিশকে জানিয়ে রেখেছিলেন। বজরং দলের কয়েকজন সদস্য ইনস্টাগ্রামে এ ব্যাপারে পোস্ট করেছিল।

"আমাকে থানায় বসিয়ে রাখা হলো, অথচ হামলাকারীদের বাধা দেওয়ার কোনো চেষ্টা করেনি পুলিশ," বলছিলেন মি. কাশ্যপ।

তার কথায়, "যে কাজটা একজন মানুষ হিসাবে করেছিলাম, তার বদলে এখন যা ঘটনা ঘটছে, সেগুলো আমাকে ভেতর থেকে ভেঙে দিচ্ছে। চিন্তা পরিবারের নিরাপত্তা নিয়ে। তবে অন্যায়ের প্রতিবাদ যেভাবে করেছি, তার জন্য প্রাণ দিতে হলেও দেব।"

কী বলছে পুলিশ?

কোটদোয়ার থানার ওসি প্রদীপ নেগি বিবিসির সহযোগী সাংবাদিক আসিফ আলিকে বলেছেন, "২৬শে জানুয়ারি কয়েকজন থানায় এসে অভিযোগ করে যে একজন মুসলমান ব্যবসায়ী দোকানের নাম 'বাবা গারমেন্টস' রেখেছেন। তারা এটাও বলে যে এরকম নামের কারণে তাদের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত লেগেছে।

"তবে ওই মুসলমান ব্যবসায়ী প্রায় ৩০ বছর ধরে দোকানটা চালাচ্ছেন। পরের দিন একটা ভিডিও ভাইরাল হয়ে যা, যেখানে একজন হিন্দু যুবক মুসলমান ব্যবসায়ীর সমর্থনে এগিয়ে আসে। ভিডিওতে তিনি নিজের পরিচয় দেন 'মুহাম্মদ দীপক' নামে। এরপরে গত শনিবার দেরাদুন থেকে বজরং দলের সদস্যরা আসে। আমরা তাদের আটকানোর চেষ্টা করেছিলাম, কিন্তু তখন তারা গাড়ি রেখে পায়ে হেঁটে এগোতে থাকে। ওরা ওই মুসলমান ব্যবসায়ীর জন্য না, দীপকের জন্য এখানে এসেছিল," জানাচ্ছিলেন থানার ওসি।

তিনি আরও বলেন যে বজরং দলের কর্মীরা মি. দীপককে 'বিশ্বাসঘাতক' বলছিল। এরপরে ওই বিক্ষোভকারীদের সামনে পড়ে যান মি. কাশ্যপ।

এখন একদিকে দীপক কাশ্যপের বিরুদ্ধে যেমন থানায় অভিযোগ জমা দিয়েছে বজরং দলের কর্মীরা, তেমনই তাদের ৩০-৪০ জনের বিরুদ্ধেও মামলা হয়েছে।