আপনি এই ওয়েবসাইটের একটি টেক্সট(লিখিত) সংস্করণ দেখছেন, যা কম ডেটা ব্যবহার করছে। ছবি ও ভিডিওসহ মূল সংস্করণ দেখতে এখানে ক্লিক করুন
টমেটো না থাকলে কি জন্ম হতো না আলুর?
- Author, ডালিয়া ভেঞ্চুরা
- Role, বিবিসি নিউজ মুনদো
- পড়ার সময়: ৬ মিনিট
নয় মিলিয়ন বা প্রায় ৯০ লাখ বছর আগের কথা। এখন যেটা দক্ষিণ আমেরিকা নামে পরিচিত, সেখানে তখন সবে আন্দিজ পর্বতমালা একটু একটু করে মাথা তুলছে। তখন গাছপালা ছিল বন্য এবং ছিল না কোনো মানুষ। এর মধ্যেই পাশাপাশি বাস করত দুটি উদ্ভিদ।
"বলা চলে, দুটি প্রজাতির উদ্ভিদ," বলছিলেন লন্ডনের ন্যাচারাল হিস্ট্রি মিউজিয়ামের উদ্ভিদবিদ ড. স্যান্ড্রা ন্যাপ।
"তার মধ্যে একটি ছিল এখন যেটাকে আমরা টমেটো বলে চিনি তার পূর্বপুরুষ (সোলানাম লাইকোপারসিকাম) এবং ছিল সোলানাম এটুবেরোসাম নামের উদ্ভিদের একটি দলের পূর্বপুরুষ, যার তিনটি বর্তমান প্রজাতি চিলি ও হুয়ান ফার্নান্দেজ দ্বীপপুঞ্জে পাওয়া যায়"।
তিনি আরও বলেন, আপনি হয়তো তাদের নাম থেকে লক্ষ্য করেছেন, উদ্ভিদ প্রজাতিগুলো সম্পর্কযুক্ত ছিল এবং তারা আন্তঃপ্রজনন করেছিল।
"এটি জিনের একটি পুনর্গঠন ছিল যা সম্পূর্ণ নতুন কিছু তৈরি করেছিল, যা এটিকে আন্দিজের ঠান্ডা, শুষ্ক আবাসস্থলে বৃদ্ধি পেতে সাহায্য করেছিল," বলেন ড. ন্যাপ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দুটি ভিন্ন প্রজাতির মধ্যে আন্তঃপ্রজনন প্রায়শই ঘটে, কখনো কখনো এটি দুর্ভাগ্যজনক ফলও নিয়ে আসে।
উদাহরণস্বরূপ, একটি স্ত্রী ঘোড়া এবং একটি পুরুষ গাধার মধ্যে ঘনিষ্ঠতার মাধ্যমে খচ্চর জন্মগ্রহণ করে। যদিও প্রাচীনকাল থেকেই এটি একটি সফল সংকর হিসেবে পরিচিত, তবে এর প্রজনন ক্ষমতার অভাব রয়েছে।
উদ্ভিদ জগতেও ভিন্ন প্রজাতির সংমিশ্রণে সংকর জাত সৃষ্টির ঘটনা প্রায়শই ঘটে উল্লেখ করে ড. ন্যাপ বলেন, আমরা প্রায়শই আমাদের বাগানের গাছপালা এভাবেই পাই।
এটি প্রাকৃতিকভাবে বা মানুষের হস্তক্ষেপের মাধ্যমে ঘটতে পারে এবং এমন উদ্ভিদ তৈরি করে যা উভয় পিতামাতার মিশ্রণ।
"কখনো কখনো এগুলো বন্ধ্যা বা নিষ্ফলা হয়ে থাকে, তাই তারা একটি নতুন বংশ বিস্তার করতে পারে না," তিনি বলেন।
কিন্তু যখন পরিস্থিতির আদর্শ সমন্বয় ঘটে, তখন মিলনের ফলাফল প্রত্যাশা ছাড়িয়ে যেতে পারে।
এখানেও তাই ঘটেছে। লাখ লাখ বছর আগে সোলানাসি পরিবারের দুটি প্রজাতির মধ্যে সেই সুযোগের মুখোমুখি হওয়ার ফলে আলুর জন্ম হয়েছিল।
"এটা খুবই আকর্ষণীয় যে আলুর মতো আমাদের কাছে নিত্যদিনের ও গুরুত্বপূর্ণ একটি জিনিসের এত প্রাচীন এবং অসাধারণ উৎপত্তি," ড. ন্যাপ বলেন।
"টমেটো হলো মা এবং ইটিউবেরোসাম হলো বাবা," জুলাই মাসে এই ঘোষণা করেছিলেন চায়নিজ একাডেমি অফ অ্যাগ্রিকালচারাল সায়েন্সেজের অধ্যাপক সানওয়েন হুয়াং। জুলাই মাাসে সেল জার্নালে প্রকাশিত হয় আন্তর্জাতিক একটি গবেষণা প্রতিবেদন, সেই গবেষণায় নেতৃত্ব দিয়েছেন তিনি।
দীর্ঘদিনের রহস্যের সমাধান
আগে থেকেই জানা ছিল–– এমন কিছু তথ্য ধরে শুরু।
বাজারে এখন যেমন দেখা যায়, শক্ত ও অনমনীয় প্রকৃতির আলু, এটা কোনোভাবেই লাল ও রসালো টমেটোর সঙ্গে মেলে না। "এগুলি খুব, খুবই একই রকম," বলেন ড. ন্যাপ যিনি গবেষণায় জড়িত ছিলেন।
বিজ্ঞানীর মতে, আলু ও টমেটোর পাতা এবং ফুল অনেকটাই একই রকম। এছাড়া একটি আলু গাছের ছোটো ফলকে একটি ছোট সবুজ টমেটোর মতোই দেখায়।
"আমরা যা দেখি তার বাইরেও আমরা দীর্ঘদিন ধরে জানি যে আলু, টমেটো ও ইটিউবেরোসাম ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত," তিনি বলেন।
"আমরা যা জানতাম না তা হলো কোনটি আলুর সবচেয়ে কাছের, কারণ বিভিন্ন জিন আমাদের বিভিন্ন গল্প বলেছিল।"
বিজ্ঞানীরা দশকের পর দশক ধরে আলুর মতো জনপ্রিয় কন্দ জাতীয় ফসলের উৎপত্তির রহস্য উন্মোচনের চেষ্টা করে আসছেন, কিন্তু তারা যে সমস্যার সম্মুখীন হয়েছেন তা হলো–– আলুর জেনেটিক্স অস্বাভাবিক।
মানুষসহ বেশিরভাগ জীবন্ত প্রজাতির প্রতিটি কোষে দুটি ক্রোমোজোম থাকে, তবে আলুর আছে চারটি।
এই রহস্য সমাধানের জন্য গবেষক দলটি আলু, টমেটো ও ইটিউবেরোসাম-সহ কয়েক ডজন প্রজাতির ১২০ টিরও বেশি জিনোম (একটি কোষে উপস্থিত জিন বা জেনেটিক উপাদানের সম্পূর্ণ সেট) বিশ্লেষণ করেছে।
তারা যে আলুর জিনোমগুলো সিকোয়েন্স করেছেন, সেগুলো প্রায় একই রকম টমেটো-ইটিউবেরোসাম বিভক্ত ছিল।
কাজেই, আলুর পূর্বপুরুষ টমেটো বা ইটিউবেরোসামের মধ্যে "একটি বা অন্যটি ছিল না, বরং উভয়ই ছিল," ড. ন্যাপ জোর দিয়ে বলেন।
লাখ লাখ বছর আগে দক্ষিণ আমেরিকার পাহাড়ের পাদদেশের এই রোমান্টিক সম্পর্কটি গবেষকরা এভাবেই আবিষ্কার করেছিলেন।
এটি একটি সফল মিলন ছিল, "কারণ এটি এমন জিন সংমিশ্রণ তৈরি করেছিল যা এই নতুন বংশকে আন্দিজের নতুন সৃষ্ট অতি উচ্চতায় বেড়ে উঠতে সহায়তা করেছিল," ড. ন্যাপ ব্যাখ্যা করেন।
এর মূল কারণ ছিল, যদিও মাটির ওপরে থাকা আলু গাছটির সঙ্গে তার জন্মদাতাদের সঙ্গে খুব মিল ছিল, তবুও এমন কিছু লুকানো ছিল যা তাদের পূর্বজদের ছিল না। এটা হলো–– কন্দ, যার দ্বারা বোঝায় ফলে পরিণত হয় এমন কাণ্ড বা মূলকে।
কন্দ থাকা মানে সঙ্গে সবসময় লাঞ্চবক্স রাখার মতো; তারা শক্তি সঞ্চয় করে যা শীত, খরা বা অন্য যেকোনো প্রতিকূল পরিস্থিতিতে উদ্ভিদটিকে টিকে থাকতে সাহায্য করে।
End of বিবিসি বাংলায় আরও পড়তে পারেন:
একটি 'জেনেটিক লটারি'
বিজ্ঞানীরা আরও একটি আকর্ষণীয় জিনিস আবিষ্কার করেছেন। যে উদ্ভিদটি কন্দ তৈরি করেছিল, সেটি যেন এক জেনেটিক লটারি জিতে তা করেছিল।
দেখা যাচ্ছে যে তাদের পূর্বপুরুষদের প্রত্যেকেরই একটি জিন ছিল যা কন্দ তৈরির জন্য গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
কোনোটিই নিজে থেকে যথেষ্ট ছিল না। কিন্তু একত্রিত হলে তারা এমন একটি প্রক্রিয়া শুরু করে যা ভূগর্ভস্থ কাণ্ডকে সুস্বাদু আলুতে রূপান্তরিত করে।
ড. ন্যাপের সাথে কাজ করা চীনা দল এমনকি এটি প্রমাণ করতেও সক্ষম হয়েছিল।
"তারা তাদের অনুমানের বিষয়ে নিশ্চিত হওয়ার জন্য অনেক চমৎকার পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছিল," তিনি বলেন, এবং জানা গিয়েছিল পূর্বপূরুষদের "জিনগুলো ছাড়া কন্দ তৈরি হয়নি"।
যে সংকরায়নের মাধ্যমে আলুর জন্ম হয়েছিল, তা আলুকে বিবর্তনের ইতিহাসে আরও এগিয়ে নেয়। কোনো ধরনের বীজ বা পরাগরেণু ছাড়াই আলুকে বংশ বিস্তারের সুযোগ এনে দেয়।
এটি বিভিন্ন ধরনের উচ্চতা ও অবস্থার সাথে খাপ খাইয়ে নিতে সক্ষম হয়েছিল, যার ফলে বৈচিত্র্যের বিস্ফোরণ ঘটেছিল।
আজও "শুধু যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চল থেকে চিলি ও ব্রাজিল পর্যন্ত আমেরিকার ওই এলাকাতেই ১০০ টিরও বেশি বন্য প্রজাতি পাওয়া যায়," ড. ন্যাপ বলেন।
End of বিবিসি বাংলায় আরও পড়তে পারেন:
দুর্বলতা
তবে অযৌনভাবে বংশবিস্তার করার এই ক্ষমতা আলুরও ক্ষতি করেছে।
"এগুলো চাষ করার জন্য আপনাকে একটি আলুর ছোট ছোট টুকরো রোপণ করতে হবে। যার অর্থ হলো যদি আপনার একটি জমিতে শুধু একটি জাতের ফসল থাকে, তবে সেগুলি মূলত ক্লোন," ড. ন্যাপ ব্যাখ্যা করেন।
জিনগতভাবে অভিন্ন হওয়ার অর্থ হলো, কোনো আলুর গাছেরই নতুন রোগের বিরুদ্ধে প্রতিরক্ষা থাকবে না।
এটি আমাদের বিজ্ঞানীরা এই গবেষণাটি কেন পরিচালনা করেছেন তার কারণের দিকে নিয়ে যায়।
ড. ন্যাপের মতে, চীনা দল এমন আলু তৈরি করতে চায় যা বীজ থেকে পুনরায় উৎপাদন করা যায় এবং জিনগতভাবে পরিবর্তিত করা যায়।
তারা আশা করে যে বন্য প্রজাতির আলুর জিনগত পরিবর্তন ঘটিয়ে এমন সব জাত তৈরি করা যেতে পারে, যা পরিবেশগত চ্যালেঞ্জগুলোকে আরও ভালোভাবে মোকাবিলা করতে পারে।
"এর পরিবর্তে এই গবেষণায় জড়িত অন্যান্য বিবর্তনীয় জীববিজ্ঞানীরা এবং আমি খুঁজে বের করতে চেয়েছিলাম, আলুর নিকটতম আত্মীয়রা কারা এবং কেন তারা এত বৈচিত্র্যময়," তিনি বলেন।
"সুতরাং, আমরা (গবেষকদের বিভিন্ন দল) খুব ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে গবেষণাটি করেছি। আর আমাদের প্রতিটি দৃষ্টিকোণ থেকে প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করতে সক্ষম হয়েছি, যা গবেষণায় অংশগ্রহণ এবং কাজ করাকে খুব আনন্দদায়ক করে তুলেছে।"