আসামে মুসলিম বেড়েছে অনুপ্রবেশের কারণেই : আদালতে ভারত সরকার

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, আসামের রাজধানী গুয়াহাটিতে ঈদ
    • Author, শুভজ্যোতি ঘোষ
    • Role, বিবিসি নিউজ বাংলা, দিল্লি

ভারতের গুয়াহাটি হাইকোর্টে চলমান এক মামলায় কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, আসামে মুসলিম জনসংখ্যা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেছে এবং ‘সীমান্তের ওপার থেকে আসা’ লোকজনরাই এ জন্য দায়ী।

গত শুক্রবার (২৮ এপ্রিল) ওই মামলার শুনানিতে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের তরফে ডেপুটি সলিসিটর জেনারেল রঞ্জিত কুমার দেব চৌধুরী আদালতে এই বক্তব্য পেশ করেন।

“ভারতের এই অংশটিকে দেশের থেকে ছিনিয়ে নিয়ে আলাদা করার জন্যই” এই ষড়যন্ত্র আঁটা হয়েছে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

আসামে যারা বিদেশি বা অবৈধ অভিবাসী হিসেবে ইতিমধ্যেই শনাক্ত হয়েছেন তাদের ডিপোর্টেশনের আগে ভারতে থাকাকালীন কী কী অধিকার প্রাপ্য, সেই সংক্রান্ত একটি মামলাতেই কেন্দ্র তাদের এই অবস্থান জানিয়েছে।

দেশের বহু আইন বিশেষজ্ঞ ও মানবাধিকার আইনজীবী কেন্দ্রীয় সরকারের এই বক্তব্যের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছেন।

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, আসামে এনআরসি অভিযান চালানো হয়েছে টানা বেশ কয়েক বছর ধরে

আসামের মুসলিম সিভিল সোসাইটির নেতৃস্থানীয়রা আবার বলছেন, রাজ্যের মুসলিম জনসংখ্যা যদি বেড়েও থাকে তাহলে সেটার জন্য সীমান্তের অন্য দিক থেকে হওয়া অনুপ্রবেশ দায়ী – এরকম দাবির কোনও ভিত্তি নেই, প্রমাণও নেই!

তবে উল্টোদিকে কোনও কোনও আইনজীবী আবার মনে করেন, আসামে যে বছরের পর বছর ধরে বেআইনি অনুপ্রবেশ ঘটেছে এনআরসি বা জাতীয় নাগরিকপঞ্জীর খসড়া পরিসংখ্যান থেকেই তা স্পষ্ট।

“আদালতে কেন্দ্রীয় সরকারের এই বক্তব্য সম্ভবত সেই উপলব্ধিরই প্রতিফলন”, বিবিসিকে জানিয়েছেন তারা।

অবৈধ অনুপ্রবেশ বস্তুত আসামে বহু পুরনো ও স্পর্শকাতর একটি রাজনৈতিক ইস্যু।

টানা বেশ কয়েক বছর ধরে রাজ্যে এনআরসি অভিযান চালানোর পরও সেই বিতর্কের কোনও মীমাংসা হয়নি – এখন আদালতে কেন্দ্রের এই অবস্থান সেই বিতর্কেই নতুন মাত্রা যোগ করবে বলে পর্যবেক্ষকরা ধারণা করছেন।

আদালতে কেন্দ্র যা বলেছে

যে মামলার সূত্র ধরে এই বিতর্ক সেটি আসলে ২০১৬ সালের। আসামের মরিগাঁও জেলার এক মুসলিম বাসিন্দার কাগজপত্রে বাবার নামে কিছু অসঙ্গতি ছিল – তার ভিত্তিতে জেলার পুলিশ সুপার একটি ‘রেফারেন্স রিপোর্ট’ দেন এবং আসামের ফরেনার্স ট্রাইব্যুনাল তাকে ‘বিদেশি’ বলে চিহ্নিত করে।

তবে এই ব্যক্তিকে এখনও অন্য দেশে ডিপোর্ট করা যায়নি। ইতিমধ্যে ২০২২ সালে ফরেনার্স ট্রাইব্যুনাল অন্য একটি মামলায় তাকে আটক করে।

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, এনআরসি-তে নাম উঠেছে কিনা, তা দেখার জন্য মরিগাঁও জেলায় একটি কম্পিউটার সেন্টারে ভিড়

এই আটকাদেশের বিরুদ্ধেই গুয়াহাটি হাইকোর্টে তিনি আপিল করেছেন এবং ট্রাইব্যুনাল যাদের ‘বিদেশি’ বলে শনাক্ত করেছে ভারতে থাকাকালীন তাদের কোন কোন অধিকার প্রাপ্য, সেই প্রশ্নেই এখন শুনানি চলছে।

গুয়াহাটি হাইকোর্টের বিচারপতি এ এম বুজর বড়ুয়া ও বিচারপতি রবিন ফুকনের বেঞ্চে ২৮ এপ্রিল এই মামলার শুনানিতেই রাষ্ট্রপক্ষের বক্তব্য তুলে ধরেন ডেপুটি সলিসিটর জেনারেল রঞ্জিত কুমার দেব চৌধুরী।

মি দেব চৌধুরী বলেন, “আদমশুমারির তথ্য বলছে, ১৯৫১ থেকেই আসামে মুসলিমদের জনসংখ্যা অস্বাভাবিক হারে বেড়ে চলেছে।”

“এখানে স্বাভাবিক নিয়মে জনসংখ্যা বাড়ছে বলেই এটা হচ্ছে তা কিন্তু নয়, বরং (সীমান্তের) অন্য পার থেকে তারা আসছে বলেই এই বিপুল বৃদ্ধি ঘটছে। আর প্রথমে এসেই তারা আশ্রয় নিচ্ছে রিজার্ভ (সংরক্ষিত) এলাকায়।”

“ভারতের এই অংশটাকে ছিনিয়ে নিয়ে অন্য দেশের সঙ্গে জুড়ে দিতেই এটা করা হয়েছে”, মন্তব্য করেন ডেপুটি সলিসিটর জেনারেল।

আসাম লাগোয়া বাংলাদেশের নাম উল্লেখ না-করলেও ‘অন্য পার’ বলতে তিনি কোথাকার কথা বোঝাতে চেয়েছেন তা অবশ্য স্পষ্টই।

Skip X post
X কনটেন্টের জন্য কি অনুমতি দেবেন?

এই নিবন্ধে Xএর কনটেন্ট রয়েছে। কোন কিছু লোড করার আগে আমরা আপনার অনুমতি চাইছি, কারণ তারা হয়ত কুকি এবং অন্যান্য প্রযুক্তি ব্যবহার করে থাকতে পারে। আপনি সম্মতি দেবার আগে হয়ত X কুকি সম্পর্কিত নীতি এবং ব্যক্তিগত বিষয়ক নীতি প়ড়ে নিতে চাইতে পারেন। এই কনটেন্ট দেখতে হলে 'সম্মতি দিচ্ছি এবং এগোন' বেছে নিন।

সতর্কবাণী: বিবিসির নয় এমন ওয়েবসাইটের কনটেন্টের জন্য বিবিসি দায়ী না

End of X post

ডেপুটি সলিসিটর জেনারেল আরও বলেন, ১৯০৫ সালে ব্রিটিশরা যে ধর্মের ভিত্তিতে বাংলা ভাগ করেছিল, তখন থেকেই মুসলিমদের আসামে এনে বসানোর প্রক্রিয়া শুরু করা হয়।

“ব্রিটিশরা তাদের এনে আসামের চরাঞ্চলে বিভিন্ন নদী বরাবর বসানোর ব্যবস্থা করে। তখন মুসলিমরা কোন এলাকায় থাকবে তার জন্য একটা লাইনও টানা হয়েছিল, যেটাকে বলা হত ইনার লাইন।”

“মুসলিমরা সেখানেই বসতি করে থাকতে শুরু করে। কিন্তু তাদের সেই থাকার কোনও আইনগত সাপোর্ট ছিল না, কারণ ইনার লাইনের অস্তিত্ত্ব ছিল শুধু কাগজেই”, আদালতকে জানান তিনি।

‘বিদেশি’ হিসেবে শনাক্ত হওয়ার পর যাদের ডিপোর্টেশন এখনো সম্ভব হয়নি, তাদের সংবিধানের ২১ নম্বর আর্টিকেল অনুসারে কেবলমাত্র ‘রাইট টু লাইফ’ বা ‘জীবনের অধিকার’ আছে বলেও মতামত দেয় কেন্দ্র।

ডেপুটি সলিসিটর জেনারেল আরও যুক্তি দেন, এই চিহ্নিত বিদেশিরা যদি আগে কোনও জমির কেনাবেচা বা লেনদেন করে থাকেন তাহলে সেটাও বাতিল বলে গণ্য হবে। সেই জমি তখন রাষ্ট্রের হেফাজতে চলে আসবে, ক্রেতা তা ভোগ করতে পারবেন না।

‘কেন্দ্রের দাবির ভিত্তি নেই’

গুয়াহাটি হাইকোর্টে কেন্দ্রীয় সরকারের এই বক্তব্যকে দেশের একাধিক প্রথম সারির আইনজীবী ‘দুর্ভাগ্যজনক’ বলে বর্ণনা করেছেন।

বিবিসিকে তাঁরা অনেকেই বলেছেন, আসামে এমন সংবেদনশীল একটি ইস্যুতে রাষ্ট্রপক্ষের কাছ থেকে এরকম দায়িত্বজ্ঞানহীন মন্তব্য প্রত্যাশিত ছিল না। ডেপুটি সলিসিটর জেনারেল তাঁর বক্তব্যের সমর্থনে কোনও প্রমাণ দেননি, সেটাও তাঁরা মনে করিয়ে দিচ্ছেন।

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, আসামে মুসলিমদের ঈদের কেনাকাটা

তবে মামলার সঙ্গে কোনও না কোনওভাবে জড়িত থাকায় কিংবা বিষয়টি ‘বিচারাধীন’ থাকায় তারা অনেকেই প্রকাশ্যে মন্তব্য করা থেকে বিরত থেকেছেন।

তবে গুয়াহাটি হাইকোর্টের সিনিয়র আইনজীবী তথা আসামে নাগরিক অধিকার সুরক্ষা সমিতির উপদেষ্টা হাফিজ রশিদ চৌধুরীকে বিবিসি বাংলাকে পরিষ্কার বলেছেন, “অনুপ্রবেশের কারণে আসামে মুসলিমদের সংখ্যা বেড়েছে এই দাবির বিন্দুমাত্র ভিত্তি নেই!”

মি চৌধুরীর কথায়, “তর্কের খাতিরে যদি ধরেও নিই রাজ্যে মুসলিমদের সংখ্যা বেড়েছে তাহলে সেটা জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতির অভাবে বা অন্য কোনও কারণে হতে পারে। কিন্তু বাংলাদেশ থেকে এসে এখানে মুসলিমরা তাদের সংখ্যা বাড়াচ্ছেন এই তথ্য কেন্দ্র কোথায় পেল?”

১৯৮৫র আসাম চুক্তিতে ১৯৭১র ২৫ মার্চকে নাগরিকত্ব পাওয়ার কাট-অফ তারিখ হিসেবে ধরা হয়েছিল। চুক্তিতে বলা হয়, ওই তারিখের আগে যারা রাজ্যে এসেছেন তারাই ভারতের নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি পাবেন এবং সেই মর্মে দেশের নাগরিকত্ব আইনও সংশোধন করা হয়।

এখন এই ন্যারেটিভকে ১৯০৫র বঙ্গভঙ্গের সময়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টাকে ‘উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’ বলেই মনে করছেন হাফিজ রশিদ চৌধুরী।

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, হাফিজ রশিদ চৌধুরী

তিনি আরও বলছিলেন, “১৯৭১র আদমশুমারির দশ বছর পর ১৯৮১তে সারা ভারতে আবার যে আদমশুমারি হয়, সেটা কিন্তু আসামে হতে পারেনি। আসামে ‘৭১র পর সেন্সাস হয়েছিল পুরো বিশ বছর বাদে, সেই ১৯৯১ সালে।”

“এখন একাত্তরে মেঘালয় বা অরুণাচল প্রদেশের মতো অনেক রাজ্যই আসামের অংশ ছিল, যেখানে মুসলিমদের সংখ্যা বরাবরই খুব কম। বিশ বছর পর আবার যখন সেন্সাস হল ততদিনে মেঘালয় বা অরুণাচলকে আসাম থেকে কেটে বাদ দিয়ে আলাদা রাজ্য করা হয়েছে।”

“ফলে ’৯১ সালের সেন্সাসে আসামে মুসলিমদের আনুপাতিক জনসংখ্যা যে বেড়ে গিয়েছিল তাতে তাই আশ্চর্য হওয়ার কারণ নেই!”

মুসলিমদের সেই সংখ্যাবৃদ্ধিকেই এখন স্রেফ রাজনৈতিক কারণে অনুপ্রবেশের ‘স্পিন’ দিয়ে পেশ করা হচ্ছে বলে পর্যবেক্ষকরা অনেকে মনে করছেন।

‘অনুপ্রবেশ একটা বাস্তবতা’

আসাম তথা ভারতের বহু বিশ্লেষকই কিন্তু মনে করেন, অবৈধ অনুপ্রবেশ আসামের ক্ষেত্রে একটা বিরাট সমস্যা এবং সেটাকে উপেক্ষা করার কোনও সুযোগ নেই।

সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী শুভদীপ রায় যেমন বলছিলেন, ভারতের শীর্ষ আদালতও কিন্তু এই পরিস্থিতির কথা স্বীকার করে নিয়েছে।

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, আসামের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী সর্বানন্দ সোনোওয়াল

বিবিসি বাংলাকে মি রায় বলছিলেন, “২০০৫ সালে সর্বানন্দ সোনোওয়াল বনাম ইউনিয়ন অব ইন্ডিয়া মামলায় সুপ্রিম কোর্ট পরিষ্কার বলেছিল আসাম বৈদেশিক আগ্রাসনের ভিক্টিম।”

“সাবেক পূর্ব পাকিস্তান এবং বর্তমান বাংলাদেশ থেকে ব্যাপক হারে অভিবাসনের কারণেই আসামে জনসংখ্যার চরিত্র বদলে গেছে বলেও বিচারপতিরা স্বীকার করে নিয়েছিলেন।”

বস্তুত ওই মামলার জেরেই পরে আসামে জাতীয় নাগরিকপঞ্জী তৈরির কাজ শুরু হয়, যা ‘এনআরসি অভিযান’ নামেও পরিচিত।

শুভদীপ রায়ের কথায়, “এনআরসি-তে প্রথমে আসামের মোট ৪০ লক্ষ বাসিন্দার নাম বাদ পড়ে, যারা নিজেদের বৈধ নাগরিকত্বের দাবির পক্ষে ঠিকঠাক কাগজপত্র পেশ করতে পারেননি।”

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, এনআরসি-র চূড়ান্ত খসড়া প্রকাশ করছেন সরকারি কর্মকর্তারা। ৩০শে জুলাই, ২০১৮

“পরে তাদের আপিলের ভিত্তিতে সংখ্যাটা ১৯ লাখে নেমে এসেছে ঠিকই, কিন্তু এটাও কোনও চূড়ান্ত পরিসংখ্যান নয়।”

“তবে ১৯ লক্ষ ধরে নিলেও বলতেই হবে ৩ কোটি ৩০ লক্ষ জনসংখ্যার রাজ্যে আসামে অন্তত ৬ শতাংশ বাসিন্দাই ভারতের বৈধ নাগরিক নন – তারা অবশ্যই অনুপ্রবেশকারী”, বলছিলেন মি রায়।

তিনি আরও জানাচ্ছেন, “আমি অবশ্যই কেন্দ্রীয় সরকারের মুখপাত্র নই। কিন্তু আমার ধারণা আদালতে ডেপুটি সলিসিটর জেনারেলের বক্তব্যে আসামের এই বাস্তবতারই প্রতিফলন ঘটেছে।”

গুয়াহাটি হাইকোর্টে এই গুরুত্বপূর্ণ মামলার পরবর্তী শুনানি হবে মঙ্গলবার (২রা মে) এবং তারপর থেকে রোজ শুনানি চলবে।