ভারতের উত্তরপ্রদেশে হাসপাতালে আগুন, ১০ নবজাতকের মৃত্যু

ঝাঁসির মেডিক্যাল কলেজের ইমারজেন্সি বিভাগ

ছবির উৎস, ANI

ছবির ক্যাপশান, ঝাঁসির মেডিক্যাল কলেজের ইমারজেন্সি বিভাগ
পড়ার সময়: ৪ মিনিট

ভারতের উত্তরপ্রদেশ রাজ্যের ঝাঁসিতে মহারাণী লক্ষ্মীবাঈ মেডিক্যাল কলেজে শুক্রবার রাতে এক ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ১০টি সদ্যোজাত শিশুর মৃত্যু হয়েছে।

সদ্যোজাত শিশুদের ইন্টেন্সিভ কেয়ার ইউনিট বা এনআইসিইউ-তেই আগুন লেগে যায় রাতে। ঝাঁসির জেলাশাসক অবিনাশ কুমার নিশ্চিত করেছেন যে এখনও পর্যন্ত ১০টি সদ্যোজাত মারা গেছে।

শনিবার সকালে রাজ্যের উপ-মুখ্যমন্ত্রী ব্রজেশ পাঠক ঘটনাস্থলে পৌঁছিয়েছেন। হাসপাতালে গিয়ে তিনি জানিয়েছেন, “পরিবার-পরিজনদের সঙ্গে নিয়ে আমরা এখন শিশুগুলির পরিচয় নিশ্চিত করছি। উচ্চস্তরীয় তদন্তের আদেশ দেওয়া হয়েছে। স্বাস্থ্য প্রশাসন ও পুলিশ পৃথকভাবে তদন্ত চালাচ্ছে। এরও পরে ম্যাজিস্ট্রেট পর্যায়ে তদন্ত হবে।”

উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথের দফতর থেকে এক্স হ্যাণ্ডেলে জানানো হয়েছে যে মৃত শিশুদের প্রত্যেকের পরিবারকে পাঁচ লক্ষ ভারতীয় টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে। গুরুতর আহতদের ৫০ হাজার ভারতীয় টাকা দেওয়ারও ঘোষণা করা হয়েছে।

কান্নায় ভেঙ্গে পড়েছে নিহত শিশুদের পরিবার

ছবির উৎস, ANI

ছবির ক্যাপশান, কান্নায় ভেঙ্গে পড়েছে নিহত শিশুদের পরিবার

কীভাবে আগুন লাগল?

ঝাঁসির চিফ মেডিক্যাল সুপারিন্টেডেন্ট সচিন মহোর শুক্রবার রাতে বলেছিলেন যে অক্সিজেন কনসেনট্রেটরে আগুন লাগার পরেই তা ছড়িয়ে পড়ে।

তার কথায়, “এনআইসিইউ ওয়ার্ডে ৪৯টি সদ্যোজাত শিশু ভর্তি ছিল। হঠাৎই অক্সিজেন কনসেনট্রেটরে আগুন লেগে যায়। আগুন নেভানোর চেষ্টা করা হয়েছিল। ওই ঘরে অক্সিজেনের মাত্রা সবসময়েই খুব বেশি রাখা হয়, তাই আগুন খুব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। যত বেশি সংখ্যক শিশুকে বাইরে বার করা সম্ভব হয়েছে, সেটাই আমরা চেষ্টা করেছি। বেশিরভাগ সদ্যোজাতকেই বার করে নিয়ে আসা গিয়েছিল। কিন্তু ১০জনকে বাঁচানো যায় নি।“

শনিবার সকালে মি. মহোরের কাছে যখন জীবিত শিশুদের শারীরিক অবস্থা সম্পর্কে জানতে চাওয়া হয়। তিনি বলেন, “সবকটি সদ্যোজাতই সুস্থ আছে। যে শিশুগুলি মারা গেছে, তাদের মধ্যে তিনজনকে এখনও সনাক্ত করা যায় নি। তাদের পরিচয় নিশ্চিত করার চেষ্টা করছি আমরা।“

হাসপাতালের তরফে গাফিলতির কথা জিজ্ঞাসা করা হলে মি. মহোর বলেন, “এখনই বলা যাচ্ছে না যে গাফিলতির কারণেই এই ঘটনা হয়েছে কী না”

জেলাশাসক অবিনাশ কুমার জানাচ্ছেন, “সেখানে যেসব কর্মী উপস্থিত ছিলেন, তাদের বক্তব্য অনুযায়ী রাত ১০.৩০ থেকে ১০.৪৫ মিনিটের মধ্যে সম্ভবত: শর্ট সার্কিট থেকে এনআইসিইউর ভেতরের অংশে আগুন লাগে।“

প্রত্যক্ষদর্শী কৃপাল সিং রাজপুত
ছবির ক্যাপশান, প্রত্যক্ষদর্শী কৃপাল সিং রাজপুত

প্রত্যক্ষদর্শীরা যা জানাচ্ছেন

একজন প্রত্যক্ষদর্শী বলছিলেন যে আগুন লাগার পরে জাল ভেঙ্গে বেশ কয়েকটি শিশুকে বার করে আনা হয়। তবে তার নিজের সন্তানের কোনও খোঁজ তিনি তখনও পান নি।

আরেক প্রত্যক্ষদর্শী কৃপাল সিং রাজপুত জানিয়েছেন,”আমি বাচ্চার দুধ দিতে ভেতরে যাচ্ছিলাম। তখনই দেখি এক ম্যাডাম দৌড়তে দৌড়তে আসছেন, তার পায়ে আগুন লেগে গিয়েছিল। তিনি প্রবল চিৎকার করছিলেন। আমি নিজে প্রায় ২০টি শিশুকে বাইরে বার করে এনেছি।

“শিশুদের কারও নাকে অক্সিজেনের নল ছিল, কারও অবস্থা সঙ্গিন ছিল। আমি শিশুদের উঠিয়ে এনে হাসপাতাল প্রশাসনের হাতে তুলে দিয়েছি – যাতে যার বাচ্চারা সুরক্ষিত থাকে। সবাই বলছে শর্ট সার্কিট থেকে আগুন লেগেছে, কিন্তু যন্ত্রগুলো ভীষণ গরম হয়ে গিয়েছিল। বাচ্চাগুলো তার ফলেই মারা গেছে,” জানাচ্ছিলেন মি. রাজপুত।

আরেক প্রত্যক্ষদর্শী ঋষভ যাদব বলছিলেন যে ওখানে তখন হুড়োহুড়ি পড়ে গিয়েছিল। আগুন লাগার সময়ে প্রায় ৫০টি সদ্যোজাত ওই ঘরে ছিল। সবাই নিজের নিজের সন্তানকে নিয়ে এমারজেন্সির দিকে দৌড়চ্ছিল।

কয়েকটি পরিবার নিজেদের সন্তানকে খুঁজেও পাচ্ছিল না বলে জানিয়েছেন মি. যাদব।

এই ওয়ার্ডেই আগুন লেগেছিল

ছবির উৎস, ANI

ছবির ক্যাপশান, এই ওয়ার্ডেই আগুন লেগেছিল

রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া

ঝাঁসির মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে আগুন লেগে ১০টি সদ্যোজাত শিশুর মৃত্যুর ঘটনায় রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, উত্তরপ্রদেশের বর্তমান ও প্রাক্তন দুই মুখ্যমন্ত্রী ও কংগ্রেস নেত্রী প্রিয়াঙ্কা গান্ধী প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন।

রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মূ এক্স হ্যাণ্ডেলে লিখেছেন, “শোকসন্তপ্ত বাবা-মা ও পরিবারের সদস্যদের ঈশ্বর এই কঠিন আঘাত সামলিয়ে ওঠার শক্তি দিন। আহত শিশুরা যাতে দ্রুত সুস্থ হয়ে ওঠে আমি সেই প্রার্থনাই করছিল।“

প্রধানমন্ত্রীর এক্স হ্যাণ্ডেলে লেখা হয়েছে, “হৃদয় বিদারক!”

“ওই ঘটনায় নিষ্পাপ সন্তানদের যারা হারালেন, তাদের প্রতি আমার গভীর শোকসন্তাপ। ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা তিনি যে তাদের অপরিসীম দু:খ সহ্য করার শক্তি দেন।“

‌এবছরের মে মাসে রাজকোটের একটি গেমিং জোনে আগুন লাগে
ছবির ক্যাপশান, ‌এবছরের মে মাসে রাজকোটের একটি গেমিং জোনে আগুন লাগে

আগুনে পুড়ে শিশু-মৃত্যুর যেসব ঘটনা

স্কিপ করুন বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল পড়ুন
আপনার হোয়াটসঅ্যাপে বিবিসি বাংলা।

বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।

ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন

বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল

ঝাঁসির হাসপাতালে আগুন লেগে ১০টি সদ্যোজাত শিশুর মৃত্যুর পরে আলোচনায় উঠে আসছে এর আগে ভারতের বিভিন্ন হাসপাতালে আগুন লেগে শিশু-মৃত্যুর নানা ঘটনা।

এবছরের ২৫শে মে দিল্লির বিবেক বিহারের এক হাসপাতালে আগুন লেগে সাতটি সদ্যোজাত শিশুর মৃত্যু হয়েছিল। পুলিশের বয়ান অনুযায়ী ওই ‘বেবি কেয়ার হাসপাতাল’টি অবৈধভাবে চলছিল। সেখানে মাত্র পাঁচটি শয্যা ছিল, তবে ভর্তি করা হয়েছিল ১২টি শিশুকে।

হাসপাতাল ভবনটি অবৈধভাবে একটি আবাসিক ভবনে চালানো হচ্ছিল, সেটিরও আবার লাইসেন্স দুমাস আগেই শেষ হয়ে গিয়েছিল বলে দমকল বিভাগ জানায় এবং সেখানে এমবিবিএস চিকিৎসকের বদলে হোমিওপ্যাথিক ডাক্তারদের রাখা হয়েছিল।

দিল্লির হাসপাতালটিতে যেদিন আগুন লেগেছিল, সেই একই দিনে গুজরাটের রাজকোটে একটি ‘গেমিং জোন’এও অগ্নিকাণ্ড ঘটে। ওই ঘটনায় মোট ২৭জন নিহত হন, যার মধ্যে ছিল নয়টি শিশুও।

সবকটি মৃতদেহই এতটাই বেশি পুড়ে গিয়েছিল যে সনাক্ত করার জন্য দেহগুলির ডিএনএ পরীক্ষা করাতে হয়।

কয়েকবছর আগে ২০২১ সালের নভেম্বরে মধ্যপ্রদেশের রাজধানী শহর ভোপালে কমলা নেহরু হাসপাতালের শিশুরোগ বিভাগে আগুন লেগে চারটি শিশুর মৃত্যু হয়। আরও তিনটি শিশু ঝলসিয়ে গিয়েছিল।

প্রশাসন জানিয়েছিল যে সেখানে অন্তত ৪০০টি শিশু সবসময়ে ভর্তি থাকত, তবে আটতলা ওই হাসপাতাল ভবনে আগুন নেভানোর কোনও বন্দোবস্তই ছিল না।

ওই ২০২১ সালেরই জানুয়ারি মাসে মহারাষ্ট্রের ভাণ্ডারা জেলা হাসপাতালের ‘নিউ বর্ণ কেয়ার ইউনিট’-এ আগুন লেগে ১০টি সদ্যোজাত শিশু মারা যায়।

তদন্তের পরে জানা গিয়েছিল যে হাসপাতালে অগ্নি নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাপনা লাগানোর প্রস্তাব ঘটনার এক বছর আগে থেকে ঝুলে থেকেছিল।

বারে বারে হাসপাতালগুলিতে আগুন লাগার ঘটনার প্রেক্ষিতে এবছর জুন মাসে কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সব রাজ্যের জন্য অগ্নি নির্বাপণ ব্যবস্থাপনা নিয়ে একটি নির্দেশ জারি করেছিল।

তবে সেই সব নির্দেশ কতটা কার্যকর করা হয়েছে, তা নিয়ে সন্দেহ দেখা দিয়েছে।